শতাব্দীর জং ধরা শিকল ভেঙেছিল যে উত্তাল মার্চে,
সেখানে ছিল না কোনো ব্যক্তিস্বার্থের ম্লান ধূলিকণা—
কেবল ছিল একজোড়া উদগ্রীব চোখ আর মানচিত্রের তৃষ্ণা।
রক্তের আল্পনায় আঁকা হয়েছিল যে মাটির কপাল,
৫৫টি বসন্ত পরে সেই মাটিতেই আজ আগাছার জয়গান।
ঘুণেধরা এই ঘুণপোকাদের দল কুরে কুরে খায় স্বাধীনতা,
স্বাধীনতা বিরোধীদের আস্ফালনে কলঙ্কিত হয় সেই পবিত্র বেদী—
যারা এখনো ছদ্মবেশে ছড়ায় বিষাক্ত নিশ্বাস এ দেশের গায়ে।
এখন আকাশে উম্মুক্ত ডানা মেলে ওড়ার তীব্র সাধ আছে,
অথচ নিশ্বাস নিতে গেলেই বিষাক্ত ধোঁয়ায় নীল হয়ে যায় ফুসফুস।
বিজাতীয় সংস্কৃতির উন্মাদনায় আমরা হারিয়েছি আজ শেকড়,
নিজস্ব ঢোল-তবলা আর মাটির গান আজ অবহেলিত ধুলোয়—
অন্ধ অনুকরণে মত্ত হয়ে ভুলেছি বাউল মন আর পহেলা বৈশাখ।
গণতন্ত্রের শ্বেতকপোত আজ খাঁচায় বন্দি নির্জীব মূর্তির মতো,
মত প্রকাশের জিহ্বায় বিঁধে আছে অদৃশ্য সব ধারালো কাঁটা।
শ্রদ্ধাবোধের ফসিল পড়ে আছে ইট-কাঠের নির্দয় অরণ্যে,
মানুষের চোখে এখন সহমর্মিতার বদলে কেবল উগ্রতার লাল আভা।
শৈবালদামের মতো শিকড়হীন কিছু মানুষ—
দেশের নাড়ি ছিঁড়ে অর্থ-সম্পদ-মেধা পাচার করে পরবাসী সিন্দুকে,
বৈদেশিক মদদে নিজ মায়ের গায়েই ছিটায় কলঙ্কের কালি।
তারা কি একবারও ভাবে না, এই পলিমাটির ঘ্রাণেই তাদের জন্ম?
মানচিত্র আছে দেয়ালে টাঙানো, কিন্তু হৃদয়ে নেই মমতার লেশ;
দেশপ্রেম কি তবে শুধু ১৬ই ডিসেম্বরের সস্তা কোনো স্লোগান?
উদ্ধত ধর্মান্ধতা আর হিংসার বিষবাষ্পে ফিকে হয়ে যাচ্ছে
আমাদের সেই শাশ্বত হাজার বছরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি।
মায়ের আঁচলে আগুন দিয়ে যারা উৎসব করে ক্ষমতার দম্ভে,
তাদের কি মনে পড়ে না সেই শহীদ মিনারের রক্তভেজা সোপান?
পতাকায় লেগে আছে আজ স্বার্থপরতার ধূসর একরাশ ধুলো,
সেই ধুলো ঝেড়ে ফেলার শপথ নেওয়ার সময় তবে কি আসেনি?
এখন প্রয়োজন এক নতুন সূর্যোদয়ের, এক শুদ্ধ জাগরণের;
দেশপ্রেম কোনো কাগুজে দলিল নয়, নয় কোনো মুখের বুলি—
এ তো রক্তকণিকার মাঝে মিশে থাকা এক পবিত্র দায়বদ্ধতা।
এসো তবে স্বকীয় সংস্কৃতিকে বুকে ধারণ করি পরম মমতায়,
বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য হোক আমাদের একমাত্র বর্ম।
দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে মাটিকে আপন করে নিতে হবে,
যেখানে অন্যায় দেখবে, সেখানেই যেন গর্জে ওঠে প্রতিবাদের ভাষা;
নীরবতা তো দেশপ্রেমের পরিপন্থী এক সুপ্ত বিশ্বাসঘাতকতা।
তরুণদের হৃদয়ে গেঁথে দিতে হবে সত্য ইতিহাসের নির্ভীক বাণী,
বিকৃতির কুয়াশা কাটিয়ে যেখানে বীরত্বের গল্প হবে আলোকবর্তিকা।
নিজের কাজটুকু সততার সাথে করাই তো শ্রেষ্ঠ প্রার্থনা,
আইন মানা, প্রকৃতি রক্ষা আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে দেয়াল হওয়া—
এসবই তো যুদ্ধের ময়দানে অস্ত্র ধরার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
মেধা নয়, আগে মনন গড়ে তুলি দেশীয় ঐতিহ্যের সুরভিত ছোঁয়ায়।
জাগো তবে হর্ষে, জাগো দেশাত্মবোধের সেই অবিনাশী মন্ত্রে,
বিভেদের প্রাচীর গুঁড়িয়ে দিয়ে এক করি আজ শত হাত।
এসো তবে অঙ্গীকার করি—এই মাটির কাছে আমাদের ঋণ শোধের;
যেখানে প্রতিটি শিশু বড় হবে একতার মন্ত্র আর উদারতার পাঠে।
আমি ভালোবাসি আমার দেশকে, মানবো এর প্রতিটি নিয়ম,
অন্যায়ের মুখে হবো বজ্রকঠিন, আর আর্তের পাশে শীতল ছায়া।
ব্যক্তিগত ক্ষুদ্রতা বিসর্জন দিয়ে গড়ি এক মানবিক স্বদেশ,
যেখানে স্বাধীনতার পূর্ণ চাঁদ হাসবে প্রতিটি মানুষের তৃপ্ত হৃদয়ে।।
তারিখ-২৬.০৩.২০২৬।। শ্যামলী, ঢাকা।
